হত্যাকারীকে ঘৃণা করি না, তার জন্য প্রার্থনা করি

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের আল নুর মসজিদে হামলার পরপরই স্বামীকে বাঁচাতে ছুটে গিয়েছিলেন হোসনে আরা আহমেদ (৪৪)। মসজিদে নারীদের নামাজ আদায়ের কক্ষে ছিলেন তিনি। সেখান থেকে অন্য নারী ও শিশুদের বেরিয়ে যেতে পথ দেখিয়েছিলেন তিনি। এরপরই ছোটেন স্বামীর খোঁজে। স্বামী ফরিদ আহমেদ হুইলচেয়ারে চলাফেরা করেন বলে হোসনে আরার দুশ্চিন্তা হচ্ছিল বেশি। তবে হামলা থেকে স্বামী বেঁচে গেলেও বাঁচতে পারেননি হোসনে আরা। হামলাকারীর গুলিতে নিহত হন তিনি। স্ত্রীর সেই হত্যাকারীকে ক্ষমা করে দিয়েছেন বলে এক প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছেন ফরিদ আহমেদ। তিনি বলেন, ‘তাঁর (হত্যাকারী) জন্য প্রার্থনা করি, আল্লাহ তাঁকে সঠিক পথ দেখাবেন।’

বিবিসি ও নিউজিল্যান্ড হেরাল্ডকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ফরিদ আহমেদ এই কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে হামলার এই উদ্দেশ্য সফল হবে না। মুসলিম নেতারা এসব হামলার কারণে কাউকে ভয় পেতে বা ঘৃণা করতে দেবেন না।

গত শুক্রবার জুমার নামাজের সময় ক্রাইস্টচার্চের আল নুর ও লিনউড মসজিদে হামলার ঘটনা ঘটে। এতে ৫০ জন নিহত হন। এর মধ্যে পাঁচজন বাংলাদেশি।

বিবিসিকে ফরিদ আহমেদ বলেন, ‘আমি আমার স্ত্রীকে হারিয়েছে। কিন্তু আমি হত্যাকারীকে ঘৃণা করি না। ব্যক্তি হিসেবে আমি তাঁকে (হামলাকারী) ভালোবাসি। কিন্তু আমি দুঃখিত, তিনি যা করেছেন, তা আমি সমর্থন করতে পারছি না। আমার মনে হয়, জীবনের কোনো একসময়ে তিনি হয়তো আঘাত পেয়েছেন। কিন্তু তিনি সেই আঘাতকে ইতিবাচক উপায়ে প্রকাশ করতে পারেননি। এ কারণে তিনি ভুল কাজ করেছেন।’

ফরিদ আহমেদ আরও বলেন, ‘যারা সন্ত্রাসী হামলা চালায়, তারা চায় লোকজন ভয় পাক। তারা এক গোষ্ঠীর সঙ্গে অন্য গোষ্ঠীর উত্তেজনা তৈরি করতে চায়। হয়তো তারা ভাবে, যদি তারা মুসলমানদের আঘাত করে, তাহলে মুসলমানেরা নিশ্চয়ই প্রতিশোধ নেবে। কিন্তু আমরা মুসলিম নেতারা বলছি, এমনটা হবে না। এই সব হামলার কারণে আমরা কাউকে ভীত হতে বা অন্যদের ঘৃণা করতে দেব না।’

হামলাকারীকে ক্ষমা করে দেওয়ার কথা জানিয়ে ফরিদ আহমেদ বলেন, ‘তাঁর সঙ্গে আমার কোনো শত্রুতা নেই। আমি তাঁকে ক্ষমা করে দিয়েছি। তাঁর জন্য প্রার্থনা করি যে, আল্লাহ তাঁকে সঠিক পথ দেখাবেন, একদিন তিনি ত্রাণকর্তা হবেন।’

স্থানীয় সময় গত শুক্রবার বেলা দেড়টার দিকে ক্রাইস্টচার্চে আল নুর মসজিদে জুমার নামাজ আদায়রত মুসল্লিদের ওপর প্রথমে সন্ত্রাসী হামলা হয়। কিছু পরে লিনউড মসজিদে দ্বিতীয় হামলা হয়। আল নুর মসজিদে স্বয়ংক্রিয় রাইফেল নিয়ে হামলার ঘটনাটি ফেসবুকে লাইভস্ট্রিম করেন হামলাকারী ব্রেনটন হ্যারিসন টারান্ট। ওই মসজিদে নামাজ আদায়ের জন্য যাচ্ছিলেন নিউজিল্যান্ড সফরে থাকা বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সদস্যরা। তাঁরা অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পান। আল নুর মসজিদে আনুমানিক ৩০০ এবং লিনউড মসজিদে শ খানেক মুসল্লি নামাজ আদায় করছিলেন বলে জানা গেছে।

নিউজিল্যান্ড হেরাল্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আল নুর মসজিদে হামলার সময় হোসনে আরা অন্য নারীদের পথ দেখাচ্ছিলেন। তিনি চিৎকার করে বলছিলেন, ‘আপনাদের সন্তানদের হাত ধরুন, এই পথে বেরিয়ে আসুন।’

হোসনে আরার স্বামী ফরিদ আহমেদ এক মদ্যপ চালকের কারণে ছয় বছর আগে গাড়ি দুর্ঘটনার শিকার হন। তখন থেকেই তিনি পক্ষাঘাতগ্রস্ত। হুইলচেয়ারে চলাফেরা করেন। ১৯৮৮ সালে ফরিদ নিউজিল্যান্ডে যান। আর হোসনে আরা যান ১৯৯৪ সালে। হোসনে আরা যেদিন নিউজিল্যান্ডে যান, সেদিনই তাঁরা বিয়ে করেন।

ঘটনার সময় স্ত্রী হোসনে আরা জানতেন, অন্যরা বেরিয়ে আসতে পারলেও তাঁর স্বামী পারবেন না। বন্দুকধারীর সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবেন তাঁর স্বামী। তাই তিনি স্বামীকে বাঁচাতে ছুটে গিয়েছিলেন।

হামলার সময়ের পরিস্থিতি তুলে ধরে ফরিদ আহমেদ বলেন, সে এক ভয়াবহ দৃশ্য ছিল। চারপাশে রক্ত। আহত লোকজন পড়ে আছে। লাশ পড়ে রয়েছে। লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক। একজন অন্যজনকে ধাক্কা দিয়ে বেরোনোর চেষ্টা করছেন। তিনি ভাবছিলেন, তিনি কীভাবে বের হবেন।

ফরিদ আহমেদ বলেন, ‘মানসিকভাবে আমি প্রস্তুত ছিলাম। নিজেকে বলছিলাম, শান্ত হও। আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। যা ঘটার ঘটবে।’

মসজিদের যে কক্ষে ফরিদ ছিলেন, সেখান থেকে তিনি বন্দুকধারীকে দেখতে পাচ্ছিলেন না। কিন্তু একের পর এক গুলির শব্দ পাচ্ছিলেন। একসময় ফরিদ দেখলেন ভিড়ের মাঝখানে একটু ফাঁকা আছে। তিনি হুইলচেয়ার ঠেলে সেদিক দিয়ে বের হওয়ার সুযোগ নিলেন।

ফরিদ আহমেদ বলেন, ‘আমি ধীরে বেরিয়ে আসছিলাম। প্রতিমুহূর্তে মনে হচ্ছিল মাথায় বা পিঠে গুলি এসে লাগবে। আমি ধীরে বেরিয়ে এলাম। মসজিদের বাইরে আমার গাড়ি পার্ক করা ছিল। আমি গাড়ির পেছনে গিয়ে থামলাম এবং সেখানেই অবস্থান করার সিদ্ধান্ত নিলাম।’

গাড়ির পেছনের দিকে নিজেকে লুকিয়ে রেখে মসজিদ থেকে নারী ও শিশুদের বেরিয়ে আসার দরজার দিকে নজর রাখলেন। কেউ বেরিয়ে এল না। তিনি নিশ্চিত ছিলেন, তাঁর স্ত্রী অন্য নারী ও শিশুদের বেরিয়ে আসতে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং সবাই নিরাপদে আছেন। স্ত্রী মসজিদের অন্য পাশে মৃত পড়ে আছেন, সে সম্পর্কে তাঁর কোনো ধারণা ছিল না।

ফরিদ বলেন, ‘বন্দুকধারীকে আমি দেখিনি। আমি শুধু গুলির শব্দ পাচ্ছিলাম। একবার কয়েক সেকেন্ডের জন্য গুলিবর্ষণ থেমেছিল। তারপর আবার শুরু হয়। আমি বুঝলাম, বন্দুকধারী ম্যাগাজিন পরিবর্তন করছেন। এমন করে সাতবার বন্দুকধারী ম্যাগাজিন পরিবর্তন করেছেন। তিনি গুলি করেই যাচ্ছিলেন। আর লোকজন ছুটছিলেন।’

মসজিদ থেকে নিরাপদে বেরিয়ে আসা তাঁর এক বন্ধু তাঁকে দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি কাঁদতে কাঁদতে ফরিদকে বলছিলেন, ‘আমি তোমাকে মসজিদে দেখেছিলাম, কিন্তু তোমাকে ফেলেই বেরিয়ে আসি।’ বন্ধুকে তিনি সান্ত্বনা দিলেন যে তিনি ঠিক কাজ করেছেন।

১০ মিনিট পর ফরিদ নিশ্চিত হলেন, গুলি থেমে গেছে। তাঁর মনে হলো, বন্দুকধারী তাঁর কাজ শেষ করতে পেরেছেন। ভাবনাটা নির্বোধের মতো মনে হলেও ওই সময় এ ছাড়া তাঁর মাথায় আর কিছু আসছিল না বলে জানান।

ফরিদ নারীদের অবস্থা বুঝতে চাইলেন, স্ত্রীর খবর জানতে চাইলেন। মসজিদের ভেতরে আবার ঢুকলেন। দেখলেন শুধু লাশ আর লাশ। লাশগুলোর পড়ে থাকার ধরন বলছিল, সবাই দৌড়ে বের হওয়ার চেষ্টা করেছেন এবং পেছন থেকে তাঁদের গুলি করা হয়েছে। মূল কক্ষে গিয়ে দেখলেন, চারপাশে বুলেটের খোসা ছড়িয়ে–ছিটিয়ে আছে। একজন তাঁর সন্তানকে জড়িয়ে ধরে আছেন, মৃত। ভয়াবহ সেই দৃশ্য। একজন লোক তাঁর কাছে সাহায্য চাইছিলেন। ওই লোকের ওপর দুজনের মৃতদেহ পড়েছিল। ওই লোক তাঁকে গায়ের ওপর থেকে মৃতদেহ সরাতে অনুরোধ জানান। তিনি তাঁকে বললেন, ‘আমি যে তা পারছি না।’

ফরিদ বলেন, একজন ইথিওপিয়ান লোক তাঁর কাছে সাহায্য চেয়ে বললেন, তিনি নিশ্বাস নিতে পারছেন না। আরেকজন এমনভাবে শ্বাস টানছিলেন যে বোঝা যাচ্ছিল, তিনি কিছুক্ষণের মধ্যে মারা যাচ্ছেন।

ফরিদ বলেন, ‘দুজনকে জীবিত পেলাম। এর মধ্যে একজন বাংলাদেশি। তাঁকে আগে থেকে চিনতাম। সেদিন সন্ধ্যায় দুই শিশুসন্তান ও অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে নিয়ে দেশে যাওয়ার কথা ছিল।’

চারপাশে এত মরদেহ পড়ে ছিল যে ফরিদের জন্য হুইলচেয়ার ঠেলে সামনে যাওয়া দুঃসাধ্য ছিল।

ফরিদ স্ত্রীর খবর জানার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়লেন, কিন্তু সেখানে হুইলচেয়ারে বসে থাকা ছাড়া তাঁর আর কিছু করার ছিল না। এক বন্ধু পরে তাঁকে বললেন, ‘ফরিদ, তোমার জন্য খারাপ খবর আছে। বাসায় চলে যাও।’

বাড়ি ফিরে ১৫ বছর বয়সী মেয়ে শিফাকে তাঁর মায়ের মৃত্যুর খবর দিলেন ফরিদ। মেয়েকে সেই দুঃসংবাদ দেওয়াটা তাঁর জন্য ছিল ভয়াবহ। মেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে বলছিল, ‘আমার মা আর নেই!’ ভেঙে পড়া মেয়েকে সান্ত্বনা দিলেন এই বলে যে তিনিই এখন তাঁর মা-বাবা সব। একসঙ্গে মুখোমুখি হতে হবে এই ঘটনার। সে সময়ের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘নিজেকে শক্ত রাখার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমি ভেঙে পড়লে আমার পরিবারও ভেঙে পড়বে। আমি বলেছি, প্রয়োজন হলে কাঁদো, কিন্তু সেই কান্না বা আবেগ যেন মানসিকভাবে ভেঙে না ফেলে।’

স্ত্রীকে নিয়ে অনেক গর্ব ফরিদের। তাঁর স্ত্রী কমিউনিটিতে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করতেন। মসজিদে শিশুদের পড়াতেন। স্ত্রী অন্যদের বাঁচাতে নিজের জীবন দিয়েছেন এবং এটাই ছিল তাঁর শেষ কাজ। ফরিদ বলেন, ‘তাঁকে নিয়ে আমি গর্ব করি। লাখ লাখ মানুষের হৃদয় জয় করেছেন তিনি। আমি মেয়েকে বলেছি, এই স্মৃতি নিয়েই আমাদের বাঁচা উচিত। তাঁর জন্য কান্নার চেয়ে সুখী হওয়া উচিত আমাদের।’

খবরটি পড়া হয়েছে :7বার!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *