হত্যার আগে ধর্ষণ বনাম তদন্তের ৩০ গজ…

শিরোনামে পুরো বাক্যটি লিখতে পারিনি। বাক্যটি হবে হত্যার আগে ধর্ষণ অথবা ক্যান্টনমেন্টের বাইরে হত্যার গবেষণা বনাম ৩০ গজের মধ্যে সহজ তদন্ত। বুঝতেই পারছেন সোহাগী জাহান তনু হত্যাকাণ্ড নিয়েই কথা বলছি। আমি বলতে চাইছি, তাকে হত্যার আগে ধর্ষণ, না শুধুই হত্যা করা হয়েছে? তাকে ক্যান্টনমেন্ট এলাকায়ই হত্যা করা হয়েছে, না বাইরে হত্যা করে ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় লাশ ফেলে রাখা হয়েছে? এ সব বিতর্কে আমরা কাটিয়ে দিলাম প্রায় দুই সপ্তাহ।

এরই মধ্যে দুবার তদন্তকারী সংস্থা পরিবর্তন করা হয়েছে। কবর থেকে লাশ তুলে আরও একদফা ময়নাতদন্ত হয়েছে। আরও অনেক কিছু হয়তো হবে। অনেক কাজের ফিরিস্তি হবে। কিন্তু যে কাজটি করা প্রয়োজন, সেই অপরাধী শনাক্তের ব্যাপারে লবডঙ্কা। আর আমি ৩০ গজের যে তদন্তের কথা বলছি, আপনাদের কাছে স্পষ্ট করব।

৩০ গজের তদন্ত স্পষ্ট করার আগে বলি, এরপরও আরও যা আপনারা দেখবেন, তাহলো ডিএনএ পরীক্ষা, রাসায়নিক পরীক্ষা, হাতের ছাপ পরীক্ষা, ইত্যাদি। আর এই ডিএনএ সাগর-রুনির মতো পরীক্ষা হতে পারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। তার রিপোর্ট আসতে লাগতে পারে দুই থেকে তিনবছর। এরপর কেউ আদালতে রিট করতে পারেন। নতুনভাবে আরেক দক্ষ সংস্থাকে তদন্ত দেওয়া হতে পারে তদন্তের দায়িত্ব। তদন্তযজ্ঞে কোনও ঘাটতি থাকবে না—এটা আমি নিশ্চিত। কিন্তু তনুর ঘাতকরা আইনের আওতায় আসবেন কিনা—এ নিয়ে আমার সন্দেহ দিনে-দিনে প্রবল হচ্ছে। কারণ মর্নিং শোজ দ্য ডে।

আমি কেন এ রকম কথা বলছি—এই প্রশ্ন হয়তো অনেকেই করতে পারেন। তার জবাবে বলতে চাই, আমি মনে করি তনু হত্যার পর প্রাথমিক তদন্তে যা প্রয়োজন, তা-ই পুলিশ এখন পর্যন্ত করেনি। আর এই প্রাথমিক তদন্ত করা হলে এরইমধ্যে অপরাধীরা চিহ্নিত হতেন বলে আমার ধারণা। কিভাবে তা ব্যাখ্যা করছি।

১.তনু ২০ এপ্রিল  বিকেল সাড়ে চারটার দিকে ক্যান্টনমেন্টের বাসা থেকে বের হন ছাত্র পড়াতে। তার দুটি বাসায় পড়ানোর কথা এবং দুটি বাসায়ই পড়িয়েছেন।  দুটি বাসাই ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে।

২. তনু প্রথমে সৈনিক জাহিদুর রহমানের বাসায় প্রাইভেট পড়ান। এরপর পাশের  সার্জেন্ট জাহিদ হোসেনের বাসায় পড়াতে যান। সেখান থেকে বের হন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে।

৩. তনুর লাশ পওয়া যায় রাত সাড়ে ১০টার দিকে। ক্যান্টনমেন্টের মধ্যে পাওয়ার হাউস এলাকায় ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের তিনশ’ থেকে চারশ’ গজ দক্ষিণে টাঙ্কিসংলগ্ন রাস্তার কালভার্টের পশ্চিম দিকে ২০ থেকে ৩০ গজ দূরে জঙ্গল বা ঝোপে। আর স্যান্ডেল পাওয়া যায় ব্রিজের নিচে।

৪. তনুর বাসা, টিউশনির বাসা এবং মৃতদেহ যেখানে পাওয়া গেছে—এই স্পটগুলো এক বর্গ কিলোমিটারের মধ্যে।

এই তথ্য দিয়ে কী পাওয়া সম্ভব, তার ব্যাখ্যা দিচ্ছি এবার।

তনু সর্বশেষ টিউশনির বাসা থেকে বের হন সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায়। আর মৃতদেহ পাওয়া যায় রাত সাড়ে ১০টায়। এর মাঝখানে মোট সময় তিন ঘণ্টা। তবে ঘটনার সময় আরও কম হতে পারে। কারণ তনুকে হত্যার পরপরইতো আর লাশ পাওয়া যায়নি।

ক্যান্টমমেন্ট এলাকায় চেকপোস্ট আছে। আর প্রতিটি চেকেপোস্টেই নিয়ম অনুযায়ী নিরাপত্তা ডিউটি থাকার কথা। ষেখানে নিরাপত্তা টহলেরও ব্যবস্থা আছে। অবস্থানগত কারণে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের ভেতর দিয়ে কয়েকটি গ্রামের লোক চলাচলের সুযোগ পান। তবে তার জন্য বিশেষ অনুমতির ব্যবস্থা আছে। এরসঙ্গে সৈনিক জাহিদুর রহমান এবং সার্জেন্ট জাহিদ হোসেনের বাসার লোকজনকেও বিবেচনায় নেওয়া যাক।

পুলিশের প্রথম কাজ হলো সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা থেকে শুরু করে রাত ১০টা পর্যন্ত কুমিল্লা ক্যান্টমেন্টের চেকপোস্ট এবং টহল দলের ডিউটি রোস্টার হাতে নেওয়া। আর সেই রোস্টার ধরে প্রয়োজন অনুযায়ী তথ্যের জন্য দায়িত্বরতদের সঙ্গে কথা বলা। তাহলে ওই তিনঘণ্টায় ক্যান্টনমেন্টে কারা ঢুকেছেন বা বের হয়েছেন তার একটা তালিকা পাওয়া যাবে। আবার এই তালিকা এন্ট্রি-এক্সিট রেজিস্ট্রারেও থাকার কথা। আর তনুও যদি ক্যান্টমেন্টের বাইরে গিয়ে থাকেন, গেটে তার রেকর্ড থাকার কথা। অথবা গেটে  যারা দায়িত্বে ছিলেন তারাও বলতে পারবেন।

তনুর লাশ যেখানে পাওয়া যায়, তার পাশেই  দুটি চারতলা ভবন আছে। তনুর বাবা ইয়ার হোসেন বলেছেন, তিনি ভবনের পাশ থেকে তিনজনকে দৌড়াদৌড়ি করতে দেখেছেন। তনুর বাবার ভাষ্যমতে একজন জওয়ান তাকে তখন বলেছেন, ওই তিনজন এখানকারই।

ওপরের পদ্ধতি অনুযায়ী সংশ্লিষ্টদের জবানবন্দি নিলে ওই তিনজনকে অথবা অপরাধীদের শনাক্ত করা খুবই সহজ।

অপরাধ বিজ্ঞান মনে করে, ঘটনাস্থলের আশেপাশেই কমপক্ষে ৭০ ভাগ আলামত, সাক্ষ্য পাওয়া যায়। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, তনুর লাশ যেখানে পাওয়া যায়, সেটা হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থল কি না? সেই প্রশ্ন তোলার আগে একটি কথা সহজেই বলা যায় যে, এটা নিয়ে তো কোনও সন্দেহ নেই যে, লাশ পাওয়ার ঘটনাস্থল ওই জায়গাটিই। আর তাই যদি হয় এই জায়গাটিকে ঘটনাস্থল ধরেই তদন্ত এগিয়ে নেওয়া তদন্তের সাধারণ নিয়ম। কিন্তু তা করা হচ্ছে না। এরপরও কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজলে আমার মনে হয়, হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থল সম্পর্কেও নিশ্চিত হওয়া যায়।

প্রশ্ন-১: যদি ধরে নেই যে, বাইরে হত্যাকাণ্ড হয়েছে অথবা বাইরের লোক ঘটিয়েছেন, তাহলে অপরাধারীরা ক্যান্টনমেন্টের মতো সংরক্ষিত এলাকায় কেন বাইরে থেকে লাশ আনার ঝুঁকি নেবেন?

খবরটি পড়া হয়েছে :799বার!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *